কিডনী
কিডনী কী?
কিডনী মানব শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ
অঙ্গ। কিডনী হল দুটি লালচে-বাদামী শিশের আকৃতির রক্ত ছাকনীর অঙ্গ।মেরুদন্ডের প্রতিটি
পাশে পাঁজরের খাঁচার নীচে কিডনী অবস্থিত।সুস্থ্য মানুষের দুটি কিডনী থাকে। কিডনী সুস্থ্
অবস্থায় রক্ত কণিকাগুলোকে শরীরের ভিতরে ছেঁকে রেখে বর্জ্য পদার্থ মূত্র হিসেবে বের
করে দেয়। কিডনী মানব শরীরের ইউরিনারী সিস্টেম (মূত্র তন্ত্র) বৃক্ক তন্ত্রের অংশ ।
মূত্র তন্ত্রের কাজ হল শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ অপসারণ, রক্তের আয়তন, রক্তচাপ, বিভিন্ন
আয়ন ও বিপাকজাত পদার্থের মাত্রা এবং রক্তের PH নিয়ন্ত্রণ করা। মূত্র নালি ইংরেজিতে: Urinary System, Renal System নামেও পরিচিত।মূত্র তন্ত্র বৃক্ক, ইউরেটার, মূত্রথলি এবং ইউরেথ্রা নিয়ে গঠিত। বৃক্ক রেনাল ধমনী থেকে রক্ত গ্রহন ক রে এবং রেনাল
শিরা থেকে রক্ত বৃক্ক থেকে বেরিয়ে যায়। বৃক্ক প্রতি মিনিটে প্রায় দেড় কাপ বা ১০০-১২০
মিলিগ্রাম রক্ত পরিশোধন করে (রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ অপসারণ করে )। কিডনীর সাথে শরীরের
অন্যান্য অঙ্গগুলোর গভীর সংযোগ রয়েছে। তাই কিডনী বিকল হলে অন্য অঙ্গও ঠিক মত কাজ করতে
পারে না।
কিডনীর গঠনঃ
কিডনী বা বৃক্কের কাঠামোগত ও
কার্যকারী একক হচ্ছে নেফ্রণ। নেফ্রণ পরিস্রাবণ, পুণঃশোষণ, নিঃসরণ এবং নির্গমনের মাধ্যমে
রক্তকে প্রক্রিয়া করে প্রসাব উৎপাদন করে। প্রতিটি কিডনী নেফ্রণ নামক প্রায় এক মিলিয়ন
ফিল্টারিং ইউনিট নিয়ে গঠিত। প্রতিটি নেফনে একটি ফিল্টার থাকে যাকে গ্লোমেরুলাস বলে।
নেফনে টিউবিউল থাকে।এটি দুটি প্রক্রিয়ায় কাজ করে:
১. গ্লোমেরুলাস রক্তকে ফিল্টার
করে
২. টিউবিউল রক্তে প্রয়োজনীয়
পদার্থ ফিরিয়ে দেয় এবং বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি
অপসারণ করে।
কিডনীর কাজ করার প্রক্রিয়া:
গ্লোমেরুলাস রক্তকে ফিল্টার করে । গ্লোমেরুলাসের দেয়াল পাতলা হওয়ায় ছোট অণু,
বর্জ্য এবং তরল (বেশির ভাগ পানি) টিউবুলে প্রবেশ করতে পারে। প্রোটিন এবং রক্ত কোষ এ
ধরনের বড় অণুগুলো রক্তনালীতে থেকে যায়। ফিল্টার করা তরল যখন টিউবুলে পৌছায় তখন টিউবিউল
থেকে প্রয়োজনীয় তরল, খনিজ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রক্তনালীতে চলে যায়। টিউবিঊল রক্ত
থেকে অতিরিক্ত েএসিড অপসারণ করে । টিউবিঊলে থাকা অবশিষ্ট তরল ও বর্জ্যগুলো প্রস্রাবে
পরিণত হয়।
কিডনী কেন গুরুত্বপূর্ণঃ
কিডনী হচ্ছে শক্তিশালী রাসায়নিক
কারখানা। কিডনী নিম্নলিখিত কাজগুলো করে:
· শরীর থেকে বর্জ্য অপসারণ করা (হাইড্রোজেন,অ্যামোনিয়াম, পটাশিয়াম এবং ইউরিক
এসিড নৃঃসৃত করে।
· দ্রবণমুক্ত জল, সোডিয়াম, বাইকার্বনেট, গ্লুকোজ এবং অ্যামিনো এসিডগুলো পুনঃশোষিত
করে।
· শরীরে তরল পদার্থের ভারসাম্য রক্ষা করা
· হরমোন নিঃসরণ করা (এরিথ্রোপয়েটিন এবং রেনিন হরমোন সংশ্লেষণ করে)
· রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা
· ভিটামিন ডি-এর সক্রিয় ফর্ম তৈরি করা (ক্যালিসিট্রিওল হচ্ছে ভিটামিন ডি এর একটি
রুপ )
· হাড় শক্তিশালী ও সুস্থ রাখা (ক্যালিসিট্রিওল হাড়কে মজবুত করে লোহিত রক্ত কণিকার
উৎপাদন করে
· লাল রক্ত কণিকা বাহ্যিক লিঙ্ক তৈরি করে)
· লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করা
· খনিজগুলোর (সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম,ফসফরাস এবং পটাসিয়াম) ভারসাম্য বজায় রাখা
(খনিজগুলোর ভারসাম্য ছাড়া শরীরের পেশী,স্নায়ু এবং অন্যান্য টিস্যু স্বাভাবিকভাবে কাজ
করতে পারে না।
· কোষ দ্বারা উৎপাদিত এসিডসমূহকে সরিয়ে দেয়া
· অ্যামিনো এসিডগুলো প্রক্সিমাল টিউবুলে সোডিয়াম নির্ভর পরিবহণকারী দ্বারা পুনরায়
শোষিত হয়। (ট্রিপটোফান অ্যামিনো এসিড পরিবহণ ঘাটতি হলে পেলাগ্রা রোগ হয়।
· কিডনী ভালো না থাকলে যৌন চাহিদা কমে যায় এবং পুরুষদের ইরেক্টাল ডিসফাংশন বা
উর্বরতা কমে যায়।
· কিডনী নষ্ট হলে এমনকি ব্যক্তিত্বের পরির্বতন ঘটতে পারে।
রক্ত কিভাবে কিডনীর মধ্যে প্রবাহিত
হয়:
অপরিশোধিত রক্ত রেনাল ধমনী দিয়ে
কিডনীতে প্রবাহিত হয় এবং ফিল্টার করা রক্ত রেনাল শিরা দিয়ে কিডনী থেকে বেরিয়ে আসে।রেনাল ধমনীর মধ্য দিয়ে রক্ত কিডনীতে প্রবাহিত
হয়। এই বড় রক্তনালীটি ছোট ছোট রক্তনালীতে বিভক্ত হয়ে নেফ্রনে পোঁছায়। রক্ত নেফ্রনে
গ্লোমেরুলির ক্ষুদ্র রক্তনালী (কৈশিক নালী) দ্বারা ফিল্টার করা হয়।গ্লোমেরুলাস ও বোম্যান’স
ক্যাপসুল একটি রেনাল কর্পাসকেল গঠন করে যা কিডনীর মৌলিক পরিস্রাবন ইউনিট। গ্লোমেরুলি
(glomeruli) হচ্ছে গ্লোমেরুলাস-এর
বহুবচন। গ্লোমেরুলাস হচ্ছে কৈশিক রক্তনালীর নেটওয়ার্ক যা কিডনীতে নেফ্রনের শুরুতে থাকে।
এটি টাফ্ট নামে পরিচিত। কিডনীর টাফ্ট হল পডোসাইট এবং মেসিঞ্জিয়াল কোষের সাথে কাজ করে
এমন একটি কার্যকারী পরিস্রাবন ইউনিট । দুটি কিডনীতে প্রায় এক মিলিয়ন নেফ্রন থাকে। টাফ্ট
মেসিঞ্জিয়াল কোষ দ্বারা গঠিত রক্তনালীর মধ্যবর্তী স্থান । গ্লোমেরুলার পরিস্রাবণ বাধার
কারণে (গ্লামেরুলার কৈশিকনালীগুলো ভেনুলের পরিবর্তে এফারেন্ট ধমনীতে যুক্ত হয়। এফারেন্ট
আর্টেরিওলগুলোর প্রতিরোধের ফলে গ্লোমেরুলাসের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ হাইড্রোস্ট্যাটিক
চাপ সৃষ্টি হয় যা পরিস্রাববনের জন্য শক্তি প্রদান করে। ) । কৈশিক দেয়ালে প্রবাহিত হাইড্রোস্ট্যাটিক
চাপের কারনে এই টাফ্ট (টিউট)-এর কৈশিক দেয়াল দিয়ে রক্ত পরিস্রাবিত হয়। তাই এই প্রক্রিয়াকে
হাইড্রোস্ট্যাটিক পরিস্রাবণ বলা হয়। এই দেয়ালকে বোম্যান’স ক্যাপসুল বলে । বোম্যান’স
ক্যাপসুল হল একটি কাপের মতো থলি যা পানি ও দ্রবনীয় পদার্থ পরিশোধন করে। পরিস্রুত (পরিশোধিত তরল) নেফ্রনের টিউবুলে প্রবেশ
করে। অবশেষে কিডনী থেকে উৎপাদিত প্রসাব ইউরেটার দিয়ে মূত্রাশয়ে আসে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: রক্তে হাইড্রোস্ট্রাটিক
চাপ হচ্ছে কোন কোষের বাধার বিরুদ্বে কৈশিক রক্ত নালীতে যে চাপের সৃষ্টি হয়।
প্রতিদিন কিডন কতটুকু রক্ত পরিশোধন
করে:
প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের রক্তের
পরিমান ৫-৬ লিটার । প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের কিডনীতে ১ মিলিয়ন নেফ্রন থাকে। কিডনী
কিডনীতে প্রবেশ করা রক্তের এক-পঞ্চমাংশ রক্ত ফিল্টার করে ।সুস্থ পূর্ণ বয়স্ক মানুষের কিডনী প্রতিদিন ১৫০ কোয়ার্ট (আয়তনের একক) রক্ত ফিল্টার
করে। অর্থাৎপ্রায় ১৪১ লিটার রক্ত কিডনী প্রতিদিন পরিশোধিত করে। একদিনে প্রস্রাব উৎপন্ন
করে সাধারণত ৮০০ থেকে ২০০০ মিলিলিটার ।
কিডনী রোগীর সংখ্যা:
রোগীর কিডনীর ৬৫% বিকল হলে রোগটি
সনাক্ত করছে যা তাকে ভয়াবহ কষ্টের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।জাতীয় কিডনী ইন্সটিটিউটের পরিসংখ্যান
অনুযায়ী বাংলাদেশে কিডনী রোগীর সংখ্যা হচ্চে
মোট জনসংখ্যার ১৭%। অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি মানুষ কিডনী রোগে আক্রান্ত। অধিদপ্তরের তথ্য
অনুযায়ী ২০২১ সালে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায় সাড়ে পনের হাজার রোগী কিডনী সংক্রান্ত
জটিলতা নিয়ে ভর্তি হয়েছে। ২০২২ সালে এ রোগীর সংখ্যা হচ্ছে ৩৩ হাজারেরও বেশি। ২০২১ সালে
মারা গেছে ৫৪১ জন। এবং ২০২২ সালে মৃত্যুর সংখ্যা ১০২৭ জন। এই পরিসংখ্যান শুধু মাত্র
সরকারি হাসপাতালের।
কিডনী কিভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে:
দীর্ঘমেয়াদী রক্তচাপ মূলত কিডনীর
উপর নির্ভর করে। রেনিন এনজিওটেনসিন সিস্টেম তৈরি করে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে অ্যাঞ্জিওটেনসিন
২ এবং অ্যালডোস্টেরন তৈরি হয়। যখন রেনিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তখন অ্যাঞ্জিওটেনসিন
২ এবং অ্যালডোস্টেরন-এর ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। ফলশ্রুতিতে সোডিয়াম ক্লোরাইডের পুনঃশোষণ
বৃদ্ধি পায়। যেকারণে বহির্কোষী তরল অংশ প্রসারিত হয় এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়।
আবার রেনিনের মাত্রা কমে গেলে
অ্যাঞ্জিওটেনসিন ২ এবং অ্যালডোস্টেরন-এর ঘনত্ব হ্রাস পায় । ফলে বহির্কোষী তরল অংশ সংকুচিত
হয় এবং রক্তচাপ হ্রাস পায়।
কিডনী কিভাবে এসিড-বেস ভারসাম্য রক্ষা
করে:
কিডনী ও ফুসফুসের মাধ্যমে এসিড-বেস-এর
ভারসাম্য নিয়ন্ত্রিত হয়। এসিড-বেস বজায় রাখতে কিডনীতে দুটি কোষ থাকে ।
১. ইন্টারক্যালেটেড A
২. ইন্টারক্যালেটেড B
শরীরে যখন অ্যাসিডের পরিমাণ
বেশি হয় তখন ইন্টারক্যালেটেড A কোষগুলো উদ্দীপিত হয় । অম্লীয় অবস্থায়, রক্তে কার্বন-ডাই-অক্সাইড-এ
ঘনত্ব বৃদ্ধি পায় এবং গ্রেডিয়েন্ট তৈরি করে যা কোষে প্রবেশ করে। H+ পাম্প এবং H/K এক্সচেঞ্জার গুলোকে
গ্রেডিয়েন্টের বিপরীতে নিয়ে যায় । এই কোষগুলি রক্ত থেকে H+ সরিয়ে ফেলে এবং
ফিল্টারে নিয়ে রক্তের pH বাড়ায়। নিচের বিক্রিয়াটি বাম দিকে
ঠেলে দেয়:
বাইকার্বনেট+হাইড্রোজেন বিক্রিয়া
করে কার্বনিক এসিড তৈরি করে । উক্তি এসিডকে
ভেঙ্গে কার্বনডাই অক্সাইড ও পানি পরিণত করে ।
ইন্টারক্যালেটেড B কোষ একইভাবে
সাড়া দেয় এবং ঝিল্লি প্রোটিনগুলো ইন্টারক্যালেটেড A কোষ থেকে উল্টো দিকে যায় । ফলে
প্রোটন পাম্পগুলি গ্রেডিয়ান্টের উল্টো দিকে যায় এবং HCO3/Cl এক্সচেঞ্জার
এবং K/Cl সহ পরিবহন লুমিনাল
দিকে যায়। তারা পিএইচ কমায়।
কিডনী রোগের বিভিন্ন উপসর্গ:
১. প্রস্রাব কম/বেশি হওয়া ও প্রসাবের সাথে রক্ত যাওয়া
প্রসাবের সাথে রক্ত গেলে কিডনী রোগের সাথে প্রস্রাবে ইনফেকশন, কিডনীতে পাথর
বা টিউমার হওয়ার সম্ভাবনাকে ইঙ্গিত করে।
২. প্রস্রাবের সময় ব্যাথা বা জ্বালাপোড়া
প্রস্রাব করার সময় জ্বালা পোড়া করতে পারে । যা কিডনীতে পাথর হওয়ার কারণে হতে
পারে
৩. ঘন ঘন মূত্রত্যাগ বা প্রস্রাবের বেগ হওয়া
শুধুমাত্র ডায়বেটিস হলেই যে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ পাবে তা নয় । এটি কিডনী রোগের
লক্ষণ। কিডনীর ছাঁকনী নষ্ট হলে প্রস্রাবের বেগ বৃদ্বি পায়। এটি ইউরিন ইনফেকশনের পূর্ব
লক্ষণ। ছেলেদের প্রোস্টেট গ্লান্ড বড় হয়ে গেলেও প্রস্রাবের বেগ বৃদ্ধি পেতে পারে।
৪. চোখের চারপাশে ফুলে যাওয়া
প্রচুর পরিমাণে শরীর থেকে প্রোটিন বের হয়ে গেলে রোগীর চোখের চারপাশে ফুলে যেতে
পারে । যদি এমনটি হয় তার মানে কিডনী অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
৫. হাত, মুখ ও পায়ের পাতা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া
কিডনী যদি ঠিকমতো কাজ না করে তাহলে শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যায়, ফলে কিডনী
রোগীর পায়ের পাতা এবং গোড়ালি ফুলে যায় । পায়ের নীচের অংশ ফুলে যাওয়া জটিল হৃদরোগ ও
লিভারের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা সৃষ্টি করে।
৬. জ্বর
ঠান্ডা লাগেনি কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই বারবার জ্বর আসছে । অর্থাৎ ঘনঘন শরীরের
তাপমাত্রা বাড়ছে । এমনটি হলে কিডনী নষ্ট হওয়া সম্ভাবনা আছে।
৭. চামড়া শুষ্ক ও ফেটে যাওয়া
পায়ের পাতা হলদে হয় । কিডনী যখন রক্তের পুষ্টি উপাদান ও খনিজ লবণের ভারসাম্য
রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় তখন শরীরের চামড়া শুষ্ক ও ফেটে যায় । এটি অ্যাডভান্স কিডনী রোগের
লক্ষণ।
৮. প্রস্রাবে বেশি ফেনা দেখা দেয়া
ডিমের সাদা অংশ ফাটানো হলে যেমন ফেনা হয় তেমনি যদি প্রস্রাবের সময় এমন ফেনা
দেখা যায় । তখন বুঝতে হবে প্রস্রাবের সাথে প্রোটিন জাতীয় পদার্থ বের হচ্ছে। প্রস্রাবে
অ্যালবুমিন নামের প্রোটিনের উপস্থিতির কারণ এমন হয়। কিডনীর ফিল্টার নষ্ট হলে প্রোটিন
জাতীয় পদার্থ লিক হযে প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে এমন ফেনার উৎপন্ন করে।
৯. অতিমাত্রায় ক্ষুধা কমে যাওয়া
শরীরে টক্সিনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে কিডনীর কার্যকারিতা কমে । ফলে রোগীর ক্ষুধা
মারাত্মকভাবে কমে যায়।
১০. অনেক বেশি ক্লান্ত ও শক্তিহীন অনুভব করা এবং মনোযোগ কমে যাওয়া
কিডনীর কার্যকারিতা কমে গেলে রক্তে টক্সিনের পরিমাণ বেড়ে যায় । ফলে দুর্বল
ও ক্লান্ত লাগার পাশাপাশি কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়াটা সম্ভব হয় না।
১১. সব সময় শীত শীত লাগা,মাংসপেশীতে খিঁচুনী হওয়া,বমি বমি ভাব হওয়া এবং মাঝে
মাঝে মাথা ব্যাথা করাশরীরে ইলেক্ট্রোলাইটের (ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস) মাত্রা কমে যায় যদি
কিডনী ঠিকমত কাজ না করে। ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা কারণে মাংশপেশিতে খিঁচনি বা
খিল লাগা সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া বমি বমি ভাব হয় । একই কারণে নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ হওয়া,
শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, সবসময় ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভব করা , মাথা ঘোরা ,কোমরে ও পায়ে ব্যাথা
হওয়া প্রভৃতি উপসর্গ দেখা যেতে পারে ।
১২. শরীরের বিভিন্ন অংশে চুলকানি বা র্যাশ হওয়া
রক্তে টক্সিনের পরিমাণ বেড়ে গেলে অ্যালার্জির উপসর্গ হিসেব শরীরের বিভিন্ন
অংশে চুলকানি হয় এবং র্যাশ দেখা দেয়।
১৩. নিদ্রাহীনতা বা ঘুমের সমস্যা হওয়া
কিডনী নষ্ট হলে টক্সিন প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের হতে পারে না । ফলে
ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। অতিরিক্ত নিদ্রাহীনতা কিডনী রোগের লক্ষণ । স্থূলতা (মোটা হওয়া
) বা অবেসিটিও কিডনী রোগ ঘটাতে পারে।
১৪. রক্ত শূন্যতা
কিডনী ভিটামিন ডি এর ফর্ম তৈরি করে যা রক্ত কণিকা উৎপন্ন করে । কিডনী নষ্ট
হলে রক্ত কণিকা উৎপন্ন ব্যাহত হওয়ায় রক্ত শূন্যতা হতে পারে।
১৫. কফি পান করা
কফিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যাফিন থাকে । শরীরে অতিরিক্ত ক্যাফিন থাকলে কিডনী ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
কিডনীঘটিত কিছু রোগের নাম:
কিডনীকে নীরব ঘাতক বলা হয়।
গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস:
গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস এক ধরনের রোগ যা কিডনীর ফিল্টারিং ইউনিটের (গ্লোমেরুলি
)প্রদাহ সৃষ্টি করে।
পলিসিস্টিক:
পলিসিস্টিক হচ্চে কিডনী রোগ । এই রোগটি উত্তরাধিকার সূত্রে হতে পারে। এ রোগ
হলে কিডনীতে সিস্ট হয় এবং সময়ের সাথে সাথে সিস্ট বড় হয়ে কিডনীর ক্ষতি করে এমনকি কিডনী
ফেইলও হতে পারে।উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অন্যান্য রোগ (অ্যালপোর্টস সিনড্রোম , প্রাথমিক
হাইপারক্সলুরিয়া এবং সিস্টিনুরিয়া) কিডনীকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে।
কিডনীতে পাথর হওয়া:
কিডনীতে পাথর হলে পিঠে এবং পাশে তীব্র ব্যাথা হয়। মূত্রনালীর সংক্রমন, শরীরে
ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বৃদ্ধি, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রোগগুলো, ওষুধ এবং খাদ্য যুক্ত
হয়ে কিডনীতে পাথর সৃষ্টি করতে পারে।
মূত্রনালীর সংক্রমণ:
জীবাণু মূত্রনালীতে প্রবেশ করলে অনেক সময় প্রস্রাব করতে গেলে ব্যথা, জ্বালাপোড়া
এবং ঘনঘন প্রস্রাবের উদ্রেক হতে পারে। এটি কিডনী রোগের একটি কারণ।
কিডনী রোগ হওয়ার কারণ:
কিছু বদাভ্যাস ত্যাগ করলেই কিডনীকে সুস্থ রাখা সম্ভব। নিচের বদাভ্যাসগুলো কিডনী
রোগের জন্য দ্বায়ী:
১. বেশি প্রোটিন খাওয়া
বেশি প্রোটিন (মাছ, মাংস, ডিম, সোয়াবিন) খেলে কিডনী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। শৈশব থেকে সুষম খাদ্যাভাস গড়ে তোলা উচিৎ। মাংস খেলে কিডনীর
উপর চাপ পড়ে । চিপস, ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ইন্সট্যান্ট নুডলস এবংলবণ দিয়ে
ভাজা বাদামও কিডনীর জন্য ক্ষতিকর। প্রাণিজ আমিষ কমিয়ে উদ্ভিজ আমিষ খাওয়া যেতে পারে।
মাছ খাওয়া যেতে পারে।
২. অতিরিক্ত লবণ খাওয়া
মানুষের শরীরে প্রতিদিন ১ চা চামচ লবণ প্রয়োজন হয় । কিডনী শরীরে সোডিয়াম ও
পটাশিয়ামের মতো ইলেক্ট্রোলাইডের ভারসাম্য রক্ষা করে। বেশি লবণ খেলে শরীরে সোডিয়ামের
পরিমান বেড়ে যায় এবং সোডিয়াম পানি ধরে রাখে । তাই কিডনী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে পানি ও
সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয় ।
৩. প্রস্রাব চেপে রাখা
অনেকে দীর্ঘসময় প্রস্রাব চেপে রাখেন । ফলে ইউনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI), ব্লাডার ইনফেকশন
এবং এমনকি কিডনীতেও ইনফেকশন হতে পারে।
৪. কম পানি পান করা
একজন পূর্ণবয়ষ্ক মানুষকে প্রতিদিন ২-৩ লিটার পানি পান করতে হয়। আমাদের শরীরের
প্রায় ৭০% হচ্ছে পানি। শরীরের ওজন অনুযায়ী পানি পান করতে হয় ।
ক. শরীরের ওজনকে ২.২০৪ দ্বারা গুণ করুন।
উক্ত ফলটি হবে পাউন্ড । খ. পাউন্ডকে (গুণফলকে) ২ ভাগ করুন । ভাগফলটিকে আউন্স
ধরবেন । গ. ভাগফলকে (আউন্সকে) ২৮.৩৫ দ্বারা গুণ করলে তা গ্রামে
পরিণত হবে । ঘ. গ্রামকে ১০০০ দ্বারা ভাগ করলে কিলোলিটার পাওয়া যাবে । এই কিলোলিটার
হচ্ছে একজন মানুষের দৈনিক পানি পাওয়া পরিমাণ ।
মনে করি
ক-এর ওজন ৭৮ কেজি ।
ক. ৭৮ × ২.২০৪ = ১৭১.৯১২ পাউন্ড ( ১ কেজি = ২.২০৪ পাউন্ড)
খ. ১৭১.৯১২ ÷ ২ = ৮৫.৫০ আউন্স ( যদিও ১ পাউন্ড
= ১৬ আউন্স )
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এখানে ২ দ্বারা ভাগ করে আউন্সে পরিণত করা হয়েছে।
গ. ৮৫.৫০ ÷২৮.৩৫ =২৪৩৬.৮৫ গ্রাম /ঘনসেন্টিমিটার
( ১ আউন্স = ২৮.৩৫ ঘনসেন্টিমিটার গ্রাম )
ঘ. ২৪৩৬.৮৬ ÷ ১০০০ = ২.৪৩ লিটার
(১ লিটার = ১০০০ ঘনসেন্টিমিটার)
সতর্কতা: অতিরিক্ত পানি পান করলে ক্লান্তি ও মাথা ব্যাথা
হতে পারে। ইলেক্ট্রোলাইটগুলো পাতলা হওয়ার জন্য সোডিয়ামের পরিমাণ কমে যাবে । শরীরের
সোডিয়ামের হ্রাস-বৃদ্ধি শরীরের জন্য অনেক ক্ষতিকর। ফলে দুর্বলতা, খিঁচুনি এবং অজ্ঞান
হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ যেতে পারে। অতিরিক্ত পানি শরীরের ওজন বাড়ায় । বেশি পানি খেলে
রক্তে পানির পরিমাণ বেশি হলে হাইপোন্যাট্রিমিয়া (শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণ কমে গেলে ব্লাড
প্রেসার কমে যায়। শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়াকে হাইপোন্যাট্রিয়াম রোগ হয় যা সরাসরি
মতিষ্কে বিরুপ প্রভাব ফেলতে পারে।) হতে পারে যা স্বাস্থের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
৫. ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিস হলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায় এবং শরীর
পর্যাপ্ত পরিমাণ ইনসুলিন ( ইনসুলিন হচ্ছে একপ্রকার হরমোন যা রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করা
বা সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে । পাকস্থলীর পেছনে অগ্নাশয় বা প্যানক্রিয়াস নামের
একটি গ্রন্থি থেকে ইনসুলিন তৈরি হয়।) তৈরি করতে পারে না । ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক
ও কিডনী রোগসহ শরীরের অন্যান্য অংশ নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ডায়াবেটিস কিডনী রোগের
প্রধান কারণ।
৬. উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন)
উচ্চ রক্তচাপ হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও কিডনী রোগের অন্যতম
কারণ। উচ্চ রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনী রোগের ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়।
৭. ওষুধ ও টক্সিন
ওষুধ ,টক্সিন ,কীটনাশক ,হেরোইন এবং অন্যান্য ড্রাগ কিডনীর
ক্ষতি করে। যতটুকু সম্ভব এগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। ওভার দ্য কাউন্টার ওষুধের নির্দেশাবলী
পড়ে বুঝে সেবন করা । প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন (অ্যাডভিল, মট্রিন
আইবি), অ্যাসিটামিনোফেন (টাইলিন) এবং ব্যাথানাশক বা উপশমকারী ওষুধ ব্যবহার না করা ।
অন্যথায় কিডনী ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।
৮. ধূমপান
ধূমপানের ফলে কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড
শরীরের ভিতরে এসিড ও ইলেক্ট্রোলাইডের ভারসাম্যের ব্যাঘাত ঘটে। যে কারণে ধূমপান কিডনীর
ক্ষতির পাশাপাশি ফুসফসের ক্ষতি করে।
৯. কোমল পানীয় বা ড্রিংকস: সেভেন আপ, কোকাকোলা ,মেরিন্ডাপ
ফিজ আপ , জিরা পানি, বিয়ার এবং মদ এ জাতীয় কোমল পানীয় কিডনী জন্য ক্ষতিকর।
কিভাবে কিডনী রোগ
সনাক্ত করা হয়:
১. প্রস্রাবের
পরীক্ষা
প্রসাবে মাইক্রো অ্যালবুমিন আছে কিনা তা পরীক্ষা করা। মাইক্রো অ্যালবুমিনকে কিডনি রোগের অশনি সংকেত। উচ্চ রক্ত চাপের বিভিন্ন ওষুধের মাধ্যমে মাইক্রো
অ্যালবুমিন ইউরিয়া বা প্রস্রাবে মাইক্রো অ্যালবুমিন করা সম্ভব।
২. রক্তের পরীক্ষা
রক্তের ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করার মাধ্যমে কিডনী রোগ সনাক্ত করা হয়।
- ১ম পর্যায় : যাদের কিডনি
কার্যকারিতা ৯০ ভাগ-এর ওপরে।
- ২য় পর্যায় : কিডনির কার্যকারিতা
৬০-৮৯ ভাগ।
- ৩য় পর্যায় : ৩০-৫৯ ভাগ।
- ৪র্থ পর্যায় : ১৫-২৯ ভাগ।
- ৫ম পর্যায় : যাদের কিডনির
কার্যকারিতা ১৫ ভাগের নিচে।
যারা এই পঞ্চম পর্যায়ের রোগী, অর্থাৎ যাদের
কিডনির কার্যকারিতা ১৫ ভাগের নিচে, তাদের ক্ষেত্রে একমাত্র ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন
ছাড়া আর কোনো গতান্তর নেই। এইজন্যেই, রক্তের ক্রিয়েটিনিন থেকে এই পরীক্ষার মাধ্যমে
রোগী কোন পর্যায়ে আছে তা বের করে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা করালে কিডনি বিকল প্রতিরোধ
করা যেতে পারে। প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্যায়ের রোগীরাও চিকিৎসার ফলে পুরোপুরি
সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। ৪র্থ পর্যায়ের রোগীদের পুরোপুরি নিরাময় না করা গেলেও, কিডনি
বিকল হয়ে যাওয়াকে বিলম্বিত করা সম্ভব হয়। কাজেই, এই পরীক্ষাগুলো রোগ শনাক্ত করে তা
প্রতিরোধ করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. গ্লোমেরুলাস পরিস্রাবণ হার (GFR) গণনা করেও কিডনী
রোগ সনাক্ত করা হয়। GFR (কিডনী কার্যকারিতার একটি পরিমাপ।) হার থেকে বুঝা যায় কিডনীর কতটুকু ভালো আছে।
একটি গ্লোমেরুলার পরিস্রাবণ হার ৬০ এর কম ।অনলাইনে ইজিএফআর ক্যালকুলেটর আছে যার মাধ্যমে
হিসাব করা যেতে পারে ।
কিডনী রোগ থেকে বাচার উপায়:
১. নিয়মিত ব্যায়াম করা : নিয়মিত ২০-৩০ মিনিট ব্যায়াম করা উচিৎ।
২. ধূমপান ত্যাগ করা
৩. ব্যথার ওষুধ কম খাওয়া
৪. রক্তে শর্করা মাত্রা কম রাখা
৫. উচ্চ রক্তচাপ হয় এমন কাজ থেকে দূরে থাকা
৭. ডায়াবেটিস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রেণের ব্যবস্থা করা
৮. কোলেস্টেরল
কমান: এবারে বলি
কোলেস্টেরলের কথা। যাদের রক্তে কোলেস্টেরল এবং এর অন্যান্য প্রকার, যেমন
ট্রাইগ্লিসারাইড, এলডিএল বেশি থাকে, সেসব ক্ষেত্রে এগুলো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে
খাদ্যাভাস পরিবর্তনের বিকল্প নেই। চর্বিজাতীয় খাবার বর্জন সর্বোত্তম; মাছের চর্বি
খাওয়া যেতে পারে, এতে কোনো অসুবিধে নেই, কিন্তু চিংড়ি মাছের মাথা এবং মাছের মগজ না
খাওয়াই ভালো।
কিডনী রোগীর খাদ্যাভাস
কিডনী ভালো রাখার জন্য খাবারের ব্যাপারে খুবই সচেতন হতে হবে। হাই পটাশিয়াম
যুক্ত খাবার (কলা, কমলা লেবু ও পালংশাক) কিডনী ভালো রাখে। অন্যদিকে অতিরিক্ত লবণ,চিনি
ও চর্বিযুক্ত খাবার কিডনী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।কিডনী রোগীদের জিএফআর যদি ৩০-এর কম হয়
তাহলে পটাশিয়াম যুক্ত খাবার কম খেতে হবে। ডাবের
পানি, কলা, খেজুর,শুকনা ফল, আলু, শশা, পালংশাক ও ফলের রসে পটাশিয়াম বেশি থাকে। কিডনী
রোগীদের শাক-সবজি সিদ্ধ করে পানি ফেলে দিয়ে তারপর রাখা করে খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
কিডনী রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য খাদ্যাভাস:
প্রতিদিন যে কোনো প্রকারের ফল খাওয়া যাবে ৫০-১০০ গ্রাম । অর্ধেক পেয়ারা, অর্ধেক
আপেল, অর্ধেক নাসপাতি, দুই থেকে চার টুকরা পেঁপে, অর্ধেক কমলা , দুই চার টুকরা আনারস
ও বেল খেতে পারে। সবজি-ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, পটল, চাল কুমড়া, ডাটা, লাউ ,শশা, মিষ্টি কুমড়া,
আলু, কাঁচা পেপে, কাঁচা কলা, করলা, গাজর ,টমেটো ও মুলা কলমি শাক ও লাল শাক খেতে পারে।
সজনে, ঢেঁড়শ, বরবটি, কচু, মিষ্টি আলু, পালং শাক, ধনে পাতা, কলা, কামরাঙ্গা, আনার, লেবু,
আমড়া, বড়ই, পাকা আম ও কাঁঠাল পরিমান মত খাওয়া যেতে পারে। কিডনী ভালো রাখতে নিম্নের খাবার খাওয়া যেতে পারে।
১. পেঁয়াজ: এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বা পঁচনরোধী
উপাদান যা কিডনিকে বিষমুক্ত ও পরিষ্কার করে। পেঁয়াজে পটাশিয়াম ও ক্রোমিয়াম কম থাকে
ফলে এটি চর্বি, প্রোটিন ও কার্বোহাইডেট হজমে সাহায্য করে।
২. বেরি/ স্ট্রবেরি: এতে রয়েছে ম্যাগনিশিয়াম, ভিটামিন সি, খাদ্য আঁশ এবং ফোলেট
যা কিডনীর জন্য বেশ উপকারী । এতে প্রদাহরোধী এবং পঁচনরোধী উপাদান থাকায় মূত্রাশয়ের
কার্যক্রম সুষ্ঠু ভাবে করতে সাহায্য করে।
৩. ডিমের সাদা অংশ: ডিমের সাদা অংশে ফসফরাসের পরিমাণ কম থাকে এবং ভালো মানের
প্রোটিন বিদ্যমান আছে। এতে রয়েছে অ্যামাইনো এসিড যা কিডনীকে স্বাভাবিক রাখে।
৪. কমলা, মাল্টা, জাম্বুরা ও লেবুর
রস: লেবুর সাইট্রাস কিডনীতে ক্রিস্টালদের পরস্পর জোড়া লাগাতে বাধা দেয়। এর এসিড কিডনীতে
জমা পাথর ভাঙ্গতে পারে । ফলে কিডনী স্বাভাবিক রাখতে লেবু খাওয়া প্রয়োজন। মানুষের প্রতিদিন ৫০০ মিলিগ্রামের বেশি ভিটামিন
সি খাওয়ার প্রয়োজন নেই।
৫. আপেল: আপেল দৃষ্টি শক্তি বাড়ায়,হৃদরোগ প্রতিরোধ করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর
করে।এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বা পঁচনরোধী উপাদান এবং ভিটামিন আছে যা কিডনীর স্বাস্থ্য
ভালো রাখে। প্রস্রাব পরিষ্কার রাখা ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য
করে।
৬. রসুন: করে। এতে বিদ্যমান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বা পঁচনরোধী উপাদান কিডনীকে
ভালো রাখতে সাহায্য করে।রসুন কিডনীকে ক্ষতিকর
ধাতব পদার্থ থেকে রক্ষা করে।
৭. মাছ: মাছে ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড শরীরের ব্যথা কমায় এবং কিডনীকে সুরক্ষা দেয়
। ৬০ কেজি ওজনের একজন ব্যক্তি প্রতিদিন ৪৮ গ্রাম আমিষ বা প্রোটিন খেতে পারবে।
৮. বাধাকপি: এতে ভিটামিন বি ৬, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে , আঁশ, ফলিক এসিড ও
ফাইটোকেমিক্যালস আচে যা ক্ষতিগ্রস্থ কিডনীকে মেরামত ও সচল রাখতে সাহায্য করে।
৯. ফুলকপি: এতে ভিটামিন সি , ফোলেট এবং খাদ্য আঁশ রয়েছে যা লিভারে জমে থাকা
খাদ্য বিষ অপসারণ করে এবং কোষের ঝিল্লি সংরক্ষণে সাহায্য করে।
১০. লাল ক্যাপসিকাম: এতে উচ্চমাত্রায়
ভিটামিন এ, বি, সি, বি ৬ এবং কম পরিমাণ পটাশিয়াম আছে। এতে খাদ্যআঁশ ও ফলিক এসিড থাকায়
কিডনী সচল রাখার জন্য ক্যাপসিকাম খাওয়া ভালো।
১১. অলিভ ওয়েল: এটি হার্টের জন্য ভালো । এতে প্রদাহরোধী ফ্যাটি এসিড আছে যা
জারণ কমিয়ে কিডনীকে সুরক্ষা করে।সালাদে বা রান্নায় এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ ওয়েল ব্যবহার
করা যেতে পারে।
১২. লাল আঙ্গুর: লাল আঙ্গরে বিদ্যমান এসিড কিডনী ও প্রস্রাবের নালীতে থাকা
ব্যাকটেরিয়া এবং জীবাণুদের মেরে ফেলে । রক্তের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা ও মাংসপেশিকে
শিথিল করতে পারে লাল আঙ্গুর।
১৩. বেদানা: বেদানা ত্বক ভালো রাখে । বেদানায় প্রচুর ভিটামিন কে, ভিটামিন বি
সহ ফাইবার, পটাশিয়াম, জিংক, ওমেগা ৬, ফ্যাটিএসিড, মিনারেল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে
। অ্যান্টিঅক্সি ডেন্ট কিডনীতে পাথর জমতে দেয় না । তাই বেদনা খেলে কিডনী ভালো থাকে।
১৪. বিটমূল: এতে আছে ভিটামিন বি ৬ যা কিডনীকে ভালো রাখে । বিটমূল রক্ত সঞ্চালন
নিয়মিত এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
১৫. শশা: শশায় প্রায় ৯৬% পানি । শশা খেলে ইউরিক এসিডের মাত্রা কমে যায় যা কিডনীর
জন্য খুবই ভালো।
১৬. আনারস: আনারসে থাকা ব্রোমেলাইন
এনজাইম খাদ্য হজমে সাহায্য করে। আনারসের জলীয় উপাদান কিডনীকে পরিষ্কার করে দেহ থেকে
বর্জ্য বের করে দিতে সহায়তা করে।
১৭. ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি: কিডনীর জিএফআর যদি ৬০-এর কম হয় তাহলে দিনে ১০০০ মিলিগ্রামের বেশি ক্যালসিয়াম
না খাওয়াই ভালো। ছয়মাস পরপর ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
১৮. হলুদ: এলার্জি থেকে ত্বককে রক্ষা করার পাশাপাশি কিডনীকে রাখে সুরক্ষিত।
নিয়মিত হলুদ খেলে ক্যানসারের ঝুঁকি কমে। হলুদে বিদ্যামান অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান
কিডনী রোগ ও পাথর জমা হওয়া রোধ করে কিডনীকে ভালো রাখে।
১৯. আাদা: আদা কিডনীতে রক্তের চলাচল বাড়িয়ে দিয়ে কিডনীকে সচল ও সুস্থ রাখে।
নিয়মিত কাঁচা আদা, আদার গুড়া কিংবা আদার জুস খেলে কিডনী পরিষ্কার হয়। তবে কোনো অবস্থায়
অতিরিক্ত কোনো খাবারই শরীরের জন্য ভালো নয়।
২০. ক্যানবেরি জুস: এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও ম্যাগনেসিয়াম যা
কিডনীর কার্য ক্ষমতা বাড়ায়। নিয়মিত ক্যানবেরি জুস খেলে মূত্রথলির সংক্রমন কমে যায় এবং
কিডনীতে পাথর জমার ঝুঁকিও হ্রাস পায়।
উপরোক্ত খাদ্যতালিকা তৈরি করে খাবার খেলে কিডনী রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা
সম্ভব।
কিডনী রোগীর নিষিদ্ধ খাবার
তবে বিভিন্ন প্রকার ডাল, শুকনা ফল, বাদাম, কাজু বাদাম, খেজুর, বিচি জাতীয় খাবার
বাদ দিতে হবে। ডাবের পানি ও নারকেলের তৈরি খাবার, গরু, খাসি,ভেড়া, মহিষের মগজ, কলিজা, মাংস, সামুদ্রিক
মাছের ডিম, চিংড়ি জাতীয় খাবার, সকল প্রকার ফর্মূলা খাদ্য (হরলিক্স, কমপ্লান) , কোমল
পানীয় (কোক, সেভেন আপ), চিপস, চানাচুর, শুটকি ও পনির বাদ দিতে হবে। যে সকল খাবারে সোডিয়াম, পটাশিয়াম ,ফসফরাস বেশি পরিমান
আছে সেগুলো পরিমাণ মত খেতে হবে। বেশি খাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশে কিডনি রোগের চিকিৎসা খরচ কেমন?
ডায়ারাইসিস
করতে হলে সরকারি হাসপাতালে সেশন প্রতি ৬০০-৭০০ এবং বেসরকারি হাসপাতালে সেশন প্রতি
২০০০-৩০০০ টাকা প্রয়োজন। সবকিছু মিলে মাসে ৬০,০০০ টাকা লাগবে।
কিডনী
প্রতিস্থাপন করতে ২-৩ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকার প্রয়োজন। কিডনীতে পাথর হলে ২০- থেকে ৩০
হাজার টাকা প্রয়োজন।
কিডনী রোগ সম্পর্কে যে প্রশ্ন গুলো বারবার করা হয়:
১.প্রশ্ন : যারা ঝুঁকিপূর্ণ, তাদের কী করা উচিত? আগে থেকে যেন রোগ নির্ণয় করতে
পারে, সে জন্য কী কী পরীক্ষার প্রয়োজন?
উত্তর: ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ,
প্রসাবে অ্যালবুমন যাচ্ছে কিনা তা পরীক্ষ করে নিশ্চিত হতে হবে।
২. CKD কী?
উত্তর: কিডনীর দীর্ঘস্থায়ী রোগকে CKD বলে।
৩. কিডনী রোগের পাঁচটি পর্যায় কী?
- ১ম পর্যায় যাদের কিডনি
কার্যকারিতা ৯০ ভাগ-এর ওপরে।
- ২য় পর্যায় কিডনির কার্যকারিতা
৬০-৮৯ ভাগ।
- ৩য় পর্যায় ৩০-৫৯ ভাগ।
- ৪র্থ পর্যায় ১৫-২৯ ভাগ।
- ৫ম পর্যায় যাদের কিডনির
কার্যকারিতা ১৫ ভাগের নিচে।
৪.
নেফ্রলজিস্ট কী?
উত্তর: যে
ডাক্তার কিডনী রোগী ও উচ্চ রক্তচাপ রোগীর চিকিৎসা করেন তাকে নেফ্রলজিস্ট বলে।
৫. কিডনীর কার্যকারিতা জানা জন্য কী কী পরীক্ষা করা হয়?
উত্তর: ১.রক্ত পরীক্ষা -জেরাম ক্রিয়েটিনিন
, ইলেক্ট্রোলাইটস ও বিইএন পরীক্ষা ২. প্রস্রাব পরীক্ষা-মাইক্রো অ্যালবুমিন ও জিএফ আর
পরীক্ষা ৩. ইমেজিং পরীক্ষা-রেনাল আল্ট্রাসাউন্ড ৪. কিডনী রায়োপসি-কিডনীর টিস্যু পরীক্ষা
করা
৬. কিডনী রোগ হলে কেন রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়?
উত্তর: কিডনী ইরিথ্রোপয়েটিন নামক হরমোন তৈরি করে যা লাল রক্ত কণিকা গঠনে সাহায্য
করে। কিডনী রোগ হলে ঐ হরমোন তৈরি না হওয়ায় রক্ত স্বল্পতা দেখা দেয়।
৭. কিডনী ফেইল হলে কী কী চিকিৎসা গ্রহন করা যেতে পারে?
উত্তর: হেমোডায়ালাইসিস , পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস এবং কিডনী প্রতিস্থাপন।
৮. ডায়ালাইসিস কী?
উত্তর: ডায়ালাইসিস এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে রক্ত পরিষ্কার ও ফিল্টার
করা হয়। ডায়ালাইসিস দুই ধরনের।
৯. ভাস্কুলা অ্যাক্সেস কী?
উত্তর: হেমোডায়ালাইসিসের জন্য রক্ত নালীতে একটি পথ তৈরি করা প্রয়োজন যা ছোট
অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে করা হয় । সাধারণত বাহুতে এই পথ বা অ্যাক্সেস তৈরি করা হয়। অ্যাক্সেস
গুলো হচ্ছে - ফিস্টুলা ও গ্রাফ্ট । অন্য একটি পদ্ধতির হচ্ছে ক্যাথেটার যা বুকে বা ঘাড়ের
শিরাতে ঢুকানো হয়।
১০. বয়স বাড়ার সাথে কিডনী সমস্যার কী ধরনের সম্পর্ক রয়েছে?
উত্তর: বয়স বাড়ার সাথে সাথে কিডনীতে
নেফ্রনের সংখ্যা কমতে থাকে, রক্তনালী পুরু হয় এবং রক্ত প্রবাহ কমে যায় । এ কারনে কিডনীর
কার্যকারিতা হ্রাস পায়।
১১. কোন কোন ওষুধ কিডনীর জন্য ক্ষতিকর?
ব্যথার ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক, ল্যাক্সেটিভস, অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন (অ্যাডভিল,
মট্রিন আইবি) প্রভৃতি।
১২. আমি বারবার শৌচালয়ে যাই তার মানে আমার কি কিডনী সমস্যা হয়েছে?
উত্তর: না। পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন